এক জোড়া সচল পা, এক বুক ভরা বাতাস আর মাইলের পর মাইল পিচঢালা বা মাটির পথ পেরিয়ে চেনা দিগন্তে পৌঁছানোর এক আদিম, অদম্য ইচ্ছা—এর নামই ম্যারাথন। আধুনিক ক্রীড়াবিশ্বে ম্যারাথন কেবল ২৬.২ মাইল বা ৪২.১৯৫ কিলোমিটারের একটি দৌড় প্রতিযোগিতা নয়; এটি মানুষের সহ্যক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং সীমাবদ্ধতাকে জয় করার এক জীবন্ত উৎসব। কিন্তু এই দীর্ঘতম দৌড়ের পেছনের ইতিহাসটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই রক্তক্ষয়ী এক আত্মত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল।
আজ আমরা ফিরে যাব প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের প্রাচীন গ্রিসে। সেখান থেকে শুরু করে আধুনিক অলিম্পিক হয়ে আজকের দিনের সুবিশাল ম্যারাথন উৎসবের বিবর্তনের গল্পটি জানব, যা প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষকে ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামতে অনুপ্রাণিত করে।



কিংবদন্তির শুরু: ম্যারাথনের যুদ্ধ ও ফাইদিপিদিসের সেই অমর দৌড়
ম্যারাথন দৌড়ের ইতিহাস জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯০ অব্দে। স্থান—প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স শহর থেকে প্রায় ২৬ মাইল দূরে অবস্থিত ‘ম্যারাথন’ নামক একটি সমতল উপত্যকা।
তখনকার সময়ে পারস্য (বর্তমান ইরান) ছিল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি। পারস্যের সম্রাট প্রথম দারিয়ুস এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে গ্রিস আক্রমণ করেন। গ্রিকদের স্বাধীনতা তখন চরম হুমকির মুখে। এথেন্সের মাত্র ১০,০০০ সৈন্যের এক বাহিনী পারসিকদের বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হয় ম্যারাথনের প্রান্তরে। যুদ্ধের ইতিহাসে এটি ‘ব্যাটল অফ ম্যারাথন’ (Battle of Marathon) নামে পরিচিত।
সবাই ভেবেছিল গ্রিকরা এই যুদ্ধে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কিন্তু রণকৌশল এবং অদম্য দেশপ্রেমের জোরে গ্রিক বাহিনী পারসিকদের অলৌকিকভাবে পরাজিত করে। যুদ্ধ জয়ের পর এথেন্সের নাগরিকরা যাতে ভীতিগ্রস্ত হয়ে শহর ছেড়ে পালিয়ে না যায় বা শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ না করে, সেজন্য অবিলম্বে এই বিজয়ের খবর এথেন্সে পৌঁছানো জরুরি ছিল।
ফাইদিপিদিসের সেই আত্মত্যাগ
এই গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ফাইদিপিদিস (Pheidippides) নামক একজন পেশাদার বার্তাবাহক বা রানারকে। তিনি ম্যারাথনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এক নাগাড়ে দৌড়াতে শুরু করেন এথেন্সের দিকে। রোদ, ধুলোবালি আর ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে তিনি মাইলের পর মাইল পাহাড়-পর্বত পার হয়ে ছুটে চলেন।
অবশেষে যখন তিনি এথেন্সের শহরের প্রবেশদ্বারে পৌঁছান, তখন তিনি ক্লান্তিতে সম্পূর্ণ নিঃশেষ। বুক ফেটে যাওয়ার উপক্রম। এথেন্সের ব্যাকুল নাগরিকদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি চিৎকার করে তার শেষ কথাটি বললেন:
“Nenikēkamen!” (আমরা জয়ী হয়েছি!)
এই সুসংবাদটি দেওয়ার পরপরই ফাইদিপিদিস মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিজের দেশের জন্য, নিজের মানুষের জন্য দেওয়া তার এই ২৬ মাইলের অবিরাম দৌড় এবং জীবন উৎসর্গ করার ঘটনাই ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকে। এই বীরত্বগাথাকে স্মরণীয় করে রাখতেই পরবর্তীতে ‘ম্যারাথন’ দৌড়ের জন্ম হয়।
কিংবদন্তি থেকে আধুনিক অলিম্পিক: ম্যারাথনের পুনর্জন্ম
ফাইদিপিদিসের এই গল্পটি বহু শতাব্দী ধরে গ্রিক লোকগাথা এবং ইতিহাসে টিকে ছিল। তবে এটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার রূপ দেওয়ার আইডিয়াটি আসে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে।
১৮৯৬ সালে গ্রিসের এথেন্সেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল আধুনিক যুগের প্রথম অলিম্পিক গেমস। ফরাসি ভাষাবিদ ও চিন্তাবিদ মিশেল ব্রেয়াল (Michel Bréal) প্রথম অলিম্পিকের আয়োজক কমিটির প্রধান ব্যারন পিয়েরে দ্য কুবার্তা (Pierre de Coubertin)-কে একটি অনন্য প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, প্রাচীন গ্রিসের সেই ঐতিহাসিক ফাইদিপিদিসের দৌড়কে স্মরণ করে প্রথম অলিম্পিকে একটি দীর্ঘ দূরত্বের দৌড় প্রতিযোগিতা রাখা হোক, যার নাম হবে ‘ম্যারাথন’।
কুবার্তা এই প্রস্তাবে রোমাঞ্চিত হন। ১৮৯৬ সালের ১০ এপ্রিল প্রথম আধুনিক অলিম্পিক ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হয়। ম্যারাথনের সেই প্রাচীন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু হয়ে এথেন্সের প্যানাথেনাইক স্টেডিয়াম পর্যন্ত এই দৌড় বিস্তৃত ছিল। দূরত্বের পরিমাপ ছিল প্রায় ৪০ কিলোমিটার (প্রায় ২৫ মাইল)।
স্পিরিডন লুইসের ঐতিহাসিক বিজয়
প্রথম অলিম্পিক ম্যারাথনে গ্রিসের মানুষের আবেগ ছিল আকাশচুম্বী। তারা চাতক পাখির মতো চেয়েছিল যেন এই ঐতিহাসিক দৌড়টিতে কোনো গ্রিক নাগরিকই জয়ী হন। আর ঠিক তা-ই ঘটেছিল। স্পিরিডন লুই (Spiridon Louis) নামক গ্রিসের এক সাধারণ পানির বাহক (Water Carrier) ২ ঘণ্টা ৫৮ মিনিট ৫০ সেকেন্ড সময় নিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
লুইস যখন স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন, তখন পুরো স্টেডিয়াম উল্লাসে ফেটে পড়ে। গ্রিসের যুবরাজরা স্বয়ং তার সাথে শেষ ল্যাপে দৌড়ান। এই বিজয় ম্যারাথনকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এক স্থায়ী আসন এনে দেয় এবং সাধারণ মানুষের মনে এক বিশাল অনুপ্রেরণার জন্ম দেয় যে—দৃঢ় ইচ্ছা থাকলে সাধারণ মানুষও অসাধারণ ইতিহাস গড়তে পারে।
২৬.২ মাইল বা ৪২.১৯৫ কিলোমিটার: দূরত্বের পেছনের রাজকীয় গল্প
আমরা আজকে যে নির্দিষ্ট ৪২.১৯৫ কিলোমিটার বা ২৬.২ মাইল দূরত্বে ম্যারাথন দৌড়াই, প্রথম দিকে কিন্তু এই দূরত্ব নির্দিষ্ট ছিল না। প্রথম কয়েকটি অলিম্পিকে এই দূরত্ব ৪০ কিলোমিটারের কাছাকাছি রাখা হতো, রুটভেদে যা কিছুটা কম-বেশি হতো।
তাহলে এই নিখুঁত ৪২.১৯৫ কিলোমিটারের হিসাবটি কোত্থেকে এলো? এর পেছনে রয়েছে ১৯০৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকের এক মজার এবং রাজকীয় ইতিহাস।
১৯০৮ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবারের অনুরোধে ম্যারাথনের স্টার্টিং পয়েন্ট বা শুরুর স্থান নির্ধারণ করা হয় উইন্ডসর ক্যাসেল (Windsor Castle)-এর বারান্দার ঠিক সামনে, যাতে রাজপরিবারের শিশুরা রানারদের দৌড় শুরু করার দৃশ্য দেখতে পারে। আর দৌড়ের সমাপ্তি রেখা বা ফিনিশ লাইন টানা হয়েছিল হোয়াইট সিটি স্টেডিয়ামে, ঠিক ব্রিটিশ রানি আলেকজান্দ্রার রাজকীয় বক্সের সামনে।
উইন্ডসর ক্যাসেল থেকে স্টেডিয়ামের রানি বক্স পর্যন্ত এই দূরত্বের সঠিক পরিমাপ ছিল ২৬ মাইল ৩৮৫ গজ, যা কিলোমিটারে রূপান্তর করলে হয় ৪২.১৯৫ কিলোমিটার।
পরবর্তী সময়ে ১৯২১ সালে আন্তর্জাতিক অপেশাদার অ্যাথলেটিক ফেডারেশন (IAAF) এই দূরত্বটিকেই ম্যারাথনের অফিশিয়াল বা আন্তর্জাতিক আদর্শ দূরত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ, আজ আমরা বিশ্বজুড়ে যে ম্যারাথন দৌড়াই, তার দৈর্ঘ্য নির্ধারণের পেছনে রয়েছে ব্রিটিশ রাজপরিবারের একটি পারিবারিক ইচ্ছা!
নারী জাগরণ এবং ম্যারাথন: ক্যাথরিন সুইটজারের বিপ্লব
ম্যারাথনের ইতিহাসে শুধু পুরুষদের বীরত্ব বা দূরত্বের গল্পই প্রধান নয়, এটি নারী অধিকার ও বৈষম্য ভাঙার এক বিশাল লড়াইয়ের প্রতীকও বটে। একটা সময় ভাবা হতো, ম্যারাথনের মতো এত দীর্ঘ এবং কঠিন দৌড় নারীদের শরীরের পক্ষে উপযুক্ত নয়, এমনকি এটি তাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। এই কুসংস্কারের কারণে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত নারীদের অফিশিয়াল ম্যারাথনে অংশগ্রহণের কোনো অনুমতি ছিল না।
এই অচলায়তন ভেঙে ইতিহাস গড়েছিলেন ক্যাথরিন সুইটজার (Kathrine Switzer)। ১৯৬৭ সালের বস্টন ম্যারাথনে তিনি নিজের আসল নাম লুকিয়ে ‘K. V. Switzer’ নামে রেজিস্ট্রেশন করেন। দৌড় শুরু হওয়ার পর রেস ডিরেক্টর জক সেম্পল যখন বুঝতে পারেন একজন নারী অফিশিয়াল নম্বর (নাম্বার ২৬১) পরে দৌড়াচ্ছেন, তখন তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে রানিং ট্র্যাকে ঢুকে পড়েন এবং ক্যাথরিনকে ধাক্কা দিয়ে রেস থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। জক চিৎকার করে বলছিলেন, “আমার রেস থেকে বেরিয়ে যাও এবং আমাকে তোমার নম্বরটা দাও!”
কিন্তু ক্যাথরিনের ট্রেইনার এবং তার বয়ফ্রেন্ড (যিনি একজন হ্যামার থ্রোয়ার ছিলেন) রেস ডিরেক্টরকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন এবং ক্যাথরিন দৌড় থামাননি। তিনি ৪ ঘণ্টা ২০ মিনিটে সেই দৌড় শেষ করে প্রমাণ করেন—নারীরাও ম্যারাথন জয়ের যোগ্যতা রাখে।
ক্যাথরিনের এই একটি দৌড় বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের অধিকারের লড়াইকে বহুদূর এগিয়ে নেয়। ফলশ্রুতিতে ১৯৭২ সালে বস্টন ম্যারাথনে নারীদের অফিশিয়াল স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং ১৯৮৪ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে প্রথম নারী ম্যারাথন যুক্ত করা হয়। আজ বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ নারী ম্যারাথনে অংশ নিচ্ছেন এবং পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফিনিশ লাইন স্পর্শ করছেন।
আধুনিক যুগে ম্যারাথন: মেগা সিটি থেকে লোকালয়
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে ম্যারাথন এলিট অ্যাথলেটদের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে ওঠে। আশির দশক থেকে শুরু হয় ‘ম্যারাথন বুম’ বা ম্যারাথনের জোয়ার। বিশ্বের বড় বড় শহরগুলো নিজস্ব ম্যারাথন ইভেন্ট আয়োজন করতে শুরু করে।
বর্তমানে বিশ্বের সেরা ছয়টি ম্যারাথনকে একত্রে ‘ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজর্স’ (World Marathon Majors) বলা হয়: ১. টোকিও ম্যারাথন ২. বস্টন ম্যারাথন ৩. লন্ডন ম্যারাথন ৪. বার্লিন ম্যারাথন ৫. শিকাগো ম্যারাথন ৬. নিউ ইয়র্ক সিটি ম্যারাথন
এই ইভেন্টগুলোতে প্রতি বছর হাজার হাজার প্রফেশনাল এবং অপেশাদার রানার অংশ নেন। রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে লাখ লাখ মানুষ করতালি দিয়ে রানারদের উৎসাহিত করে। এটি এখন আর কেবল প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি শহরের সংস্কৃতি, পর্যটন এবং সুস্থ জীবনধারার উৎসবে পরিণত হয়েছে।
গ্রামীণ প্রেক্ষাপট ও ‘ভিলেজ ম্যারাথন’-এর উত্থান
শহরের ইট-পাথর আর পিচঢালা রাস্তার বাইরে ম্যারাথনের এই চেতনা যখন গ্রামীণ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা এক নতুন রূপ ধারণ করে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে “ভিলেজ ম্যারাথন” বা গ্রামীণ ম্যারাথন এক অনন্য বিপ্লব। শহরের দূষিত বাতাস আর যান্ত্রিকতা ছেড়ে গ্রামের আঁকাবাঁকা মাটির পথ, সবুজ ধানক্ষেত, আর পাখির কলকাকলির মধ্য দিয়ে দৌড়ানো মানুষের শরীর ও মনকে এক আদিম প্রশান্তি দেয়।
ভিলেজ ম্যারাথন কেবল স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় না, এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, পর্যটন এবং সুস্থ সামাজিক মেলবন্ধনের এক দারুণ মাধ্যম। এটি প্রমাণ করে যে, ফিটনেস বা ম্যারাথনের সংস্কৃতি কেবল শহুরে উচ্চবিত্তের বিলাসবহুল লাইফস্টাইল নয়; এটি আমাদের শেকড়ের, আমাদের বাংলার প্রতিটি গ্রামের মেঠোপথের গল্প।
মানব ক্ষমতার সীমানা ভাঙার গল্প: ২ ঘণ্টার কম সময়ে ম্যারাথন
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে বলছিলেন, মানুষের পক্ষে কোনোদিনই ২ ঘণ্টার কম সময়ে ৪২.১৯৫ কিলোমিটার পথ দৌড়ে পার করা সম্ভব নয়। মানুষের ফুসফুস এবং পেশির একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু মানুষ তো সব সময়ই অসম্ভবকে সম্ভব করতে ভালোবাসে।
২০১৯ সালের ১২ অক্টোবর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় কেনিয়ার কিংবদন্তি অ্যাথলেট এলিউড কিপচোগে (Eliud Kipchoge) মানব ইতিহাসের সেই অভেদ্য প্রাচীরটি ভেঙে ফেলেন। ‘Ineos 1:59 Challenge’-এ তিনি মাত্র ১ ঘণ্টা ৫৯ মিনিট ৪০.২ সেকেন্ডে ম্যারাথন দূরত্ব অতিক্রম করেন।
যদিও এটি একটি বিশেষ কৃত্রিম পরিবেশ এবং পেসমেকারদের সহায়তায় করা হয়েছিল, তাই এটি অফিশিয়াল বিশ্ব রেকর্ড হিসেবে গণ্য হয়নি (অফিশিয়াল বিশ্ব রেকর্ডটি প্রয়াত কেলভিন কিপটামের নামে ২ ঘণ্টা ৩৫ সেকেন্ডের), তবুও কিপচোগের এই অর্জন মানবজাতিকে এক নতুন বার্তা দেয়। কিপচোগের একটি বিখ্যাত উক্তি আজ বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের জীবনের মন্ত্র:
“No Human Is Limited” (কোনো মানুষই সীমাবদ্ধ নয়)
তিনি প্রমাণ করেছেন, আমাদের মনের ভেতর যে সীমাবদ্ধতার দেয়াল আমরা তুলে রাখি, সঠিক পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে তাকে অনায়াসে ভেঙে ফেলা সম্ভব।
কেন আপনি ম্যারাথন দৌড়াবেন?
ইতিহাসের পাতা উল্টে আমরা ফাইদিপিদিস থেকে কিপচোগের গল্প শুনলাম। কিন্তু আপনার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, “আমি কেন দৌড়াব? আমি তো কোনো অলিম্পিক মেডেল জিতব না।”
এখানেই ম্যারাথনের আসল সৌন্দর্য। ম্যারাথনে অংশ নেওয়া ৯৯% মানুষই মেডেল জেতার জন্য দৌড়ান না। তারা দৌড়ান নিজের ভেতরের অলসতা, ভয় আর জড়তাকে জয় করার জন্য। ম্যারাথন আপনাকে জীবনের কিছু অমূল্য শিক্ষা দেয়:
ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা: আপনি একদিন ঘুম থেকে উঠেই ৪২ কিলোমিটার দৌড়াতে পারবেন না। এর জন্য প্রয়োজন মাসের পর মাস নিয়ম মেনে ছোট ছোট পদক্ষেপ নেওয়া। জীবনটাও ঠিক এমনই; রাতারাতি সাফল্য আসে না, প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রচেষ্টাই বড় বিজয়ের জন্ম দেয়।
মানসিক দৃঢ়তা: দৌড়ের মাঝামাঝি সময়ে যখন আপনার পা ভারী হয়ে আসবে, ফুসফুস জবাব দিতে চাইবে, তখন আপনার মন বলবে—”থেমে যাও, আর পারছি না।” সেই মুহূর্তে মনের নেতিবাচকতাকে হারিয়ে পা দুটিকে সচল রাখার যে লড়াই, তা আপনাকে মানসিকভাবে ইস্পাতকঠিন করে তোলে। যে ব্যক্তি ম্যারাথনের ফিনিশ লাইন পার হতে পারে, জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার আত্মবিশ্বাস সে পেয়ে যায়।
শ্রেণিহীন সমাজ ও একতা: ম্যারাথনের ট্র্যাকে কোনো ধনী-দরিদ্র, সিইও বা সাধারণ চাকুরিজীবী ভেদ থাকে না। সবাই একই জার্সি পরে, একই লক্ষ্য নিয়ে একই পথে দৌড়ায়। একে অপরকে পানি এগিয়ে দেয়, পড়ে গেলে টেনে তোলে। এটি মানুষকে ভালোবাসতে এবং একে অপরকে সম্মান করতে শেখায়।
উপসংহার
২৫০০ বছর আগে গ্রিসের ম্যারাথন উপত্যকায় যে দৌড়টি শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার বার্তা নিয়ে, আজ তা বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের সুস্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস আর একতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাইদিপিদিস সেদিন নিজের জীবন দিয়ে এথেন্সকে বাঁচিয়েছিলেন, আর আজ ম্যারাথন আমাদের যান্ত্রিক জীবন, বিষণ্নতা আর শারীরিক অসুস্থতা থেকে বাঁচিয়ে এক নতুন জীবনের সন্ধান দেয়।
আপনার বাড়ির কাছের মেঠোপথ কিংবা শহরের রাজপথ—সবখানেই লুকিয়ে আছে একটি ম্যারাথনের গল্প। আজই পায়ে গলিয়ে নিন এক জোড়া রানিং জুতো। লক্ষ্যটা প্রথম দিনেই ৪২ কিলোমিটার হওয়া চাই না; লক্ষ্য হোক কেবল ঘর থেকে বের হওয়া, নিজের অলসতাকে পরাজিত করা।
মনে রাখবেন, আপনি যখন ম্যারাথনের ট্র্যাকে নামছেন, আপনি কেবল একটি দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন না; আপনি আড়াই হাজার বছরের এক গৌরবময় ইতিহাসের অংশ হচ্ছেন।
তাহলে আর দেরি কেন? চলুন, শরীর ও মনের সুস্থতার লক্ষ্যে, সব সীমাবদ্ধতা ভেঙে আমরাও মেতে উঠি ভিলেজ ম্যারাথনের এই মহোৎসবে। শুভ দৌড়!

